ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ভৈরব কি সত্যিই জেলা হতে যাচ্ছে, সরকার কি দিচ্ছে সবুজ সংকেত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 28, 2025 ইং
ভৈরব কি সত্যিই জেলা হতে যাচ্ছে, সরকার কি দিচ্ছে সবুজ সংকেত ছবির ক্যাপশন: সংগ্রহীত
ad728
‎কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলাকে জেলায় রূপান্তরের দাবিতে আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজপথ। দফায় দফায় সড়ক, রেল ও নৌপথ অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচিতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম প্রধান এই বাণিজ্যিক কেন্দ্র। 'ভৈরব জেলা বাস্তবায়ন কমিটি' ও 'ভৈরবের সর্বস্তরের জনতা'-এর ব্যানারে এই আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
‎এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হলো— ভৈরব কি সত্যিই একটি জেলার মর্যাদা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে? নাকি এটি কেবলই একটি স্থানীয় আবেগতাড়িত দাবি? এর উত্তর খুঁজতে হলে ভৈরবের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
‎জেলার দাবির যৌক্তিকতা: ভৈরবের শক্তি কোথায়?
‎ভৈরবকে জেলা হিসেবে চাওয়ার পেছনে আন্দোলনকারীদের যুক্তিগুলো কেবল আবেগকেন্দ্রিক নয়, বরং তথ্য-উপাত্ত ও বাস্তবতার নিরিখে বেশ শক্তিশালী।
‎১. দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও শিল্প কেন্দ্র:
‎ভৈরব ব্রিটিশ আমল থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য নগরী। বর্তমানে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার। বিশেষ করে পাদুকা শিল্পে ভৈরব এক বিপ্লব ঘটিয়েছে, যেখানে হাজার হাজার কারখানা ও লক্ষাধিক শ্রমিক জড়িত। তাছাড়া, ভৈরবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এর একটি শিল্প নগরী থাকায় এটি একটি আনুষ্ঠানিক শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে, যা এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়েছে। এছাড়া চাল, ডাল, সিমেন্ট, সার ও মাছের আড়তের জন্য ভৈরব বিখ্যাত। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আয়ের দিক থেকে ভৈরব অনেক জেলা সদরকেও পেছনে ফেলার ক্ষমতা রাখে।
‎২. যোগাযোগের 'হাব' (Hub):
‎ভৌগোলিকভাবে ভৈরব এক অনন্য অবস্থানে রয়েছে।
‎ সড়কপথ: দেশের প্রধান দুটি মহাসড়ক— ঢাকা-সিলেট এবং ভৈরব-ময়মনসিংহ— ভৈরবের ওপর দিয়ে গেছে।
‎রেলপথ: ভৈরব একটি 'এ' ক্যাটাগরির রেলওয়ে জংশন। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের সংযোগস্থল এটি।
‎নৌপথ: মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত ভৈরব একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্যবাহী জাহাজ ও কার্গো চলাচল করে। যোগাযোগের এমন ত্রি-মাত্রিক সুবিধা বাংলাদেশের খুব কম উপজেলাতেই আছে।
‎৩. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সরকারি স্বীকৃতি:
‎ভৈরববাসীর এই দাবি নতুন নয়। তবে তাদের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ২০০৯ সালের একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন। সে সময় সরকার ভৈরবকে জেলা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় এবং একটি পরীক্ষামূলক কমিটি গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। আন্দোলনকারীদের মতে, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ষড়যন্ত্রের কারণে সেই সিদ্ধান্ত আর বাস্তবায়িত হয়নি। তাদের দাবি, নতুন করে কিছু চাওয়ার নেই, পুরোনো সেই সরকারি সিদ্ধান্তেরই বাস্তবায়ন চান তারা।
‎৪. জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা:
‎ভৈরব উপজেলা (পাশাপাশি কুলিয়ারচর উপজেলাকেও এর সাথে যুক্ত করার একটি প্রস্তাবনা রয়েছে) জনসংখ্যা ও আয়তনের দিক থেকে একটি জেলার ভার বহনের ক্ষমতা রাখে। এখানে ইতোমধ্যে হাইওয়ে পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, নৌ-পুলিশের দপ্তর এবং উন্নত সরকারি হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অবকাঠামো বিদ্যমান।
‎বিবেচ্য বিষয় ও চ্যালেঞ্জ:
‎ভৈরবের পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি থাকা সত্ত্বেও, একটি নতুন জেলা গঠনের প্রক্রিয়া বেশ জটিল এবং এর কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
‎কিশোরগঞ্জ জেলার প্রতিক্রিয়া: ভৈরব কিশোরগঞ্জ জেলার প্রধান রাজস্ব আয়ের উৎস। ভৈরব পৃথক হয়ে গেলে মূল কিশোরগঞ্জ জেলার অর্থনৈতিক কাঠামোতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। এটি একটি প্রধান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয়।
‎প্রশাসনিক ব্যয়: একটি নতুন জেলা প্রতিষ্ঠা করা মানে হলো নতুন জেলা প্রশাসক (DC), পুলিশ সুপার (SP)-এর কার্যালয়, জেলা জজ কোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট আরও অসংখ্য দপ্তর স্থাপন করা, যা একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া।
‎আঞ্চলিক ভারসাম্য: ভৈরবকে জেলা করা হলে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য বড় উপজেলাগুলো থেকেও একই ধরনের দাবি জোরালো হতে পারে, যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
‎তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভৈরবের জেলার দাবিটি কেবল আবেগনির্ভর নয়। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা, বিসিক শিল্প নগরীর উপস্থিতি, দেশের অন্যতম সেরা যোগাযোগ অবকাঠামো এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট— এই মানদণ্ডগুলোতে ভৈরব অনেক এগিয়ে। ২০০৯ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপন এই দাবিকে একটি আইনি ও নৈতিক ভিত্তি দিয়েছে।
‎বর্তমানে চলমান তীব্র আন্দোলন প্রমাণ করে, স্থানীয় জনমত এই দাবির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সরকারের উচ্চপর্যায়ের। সরকারকে ভৈরববাসীর এই যৌক্তিক দাবির বিপরীতে একটি নতুন জেলা স্থাপনের প্রশাসনিক ব্যয় এবং মূল কিশোরগঞ্জ জেলার ওপর এর প্রভাব— এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চ্যানেল দিগন্ত

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ জানা গেল

২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ জানা গেল