নড়াইল শহরের মহিষখোলার সেই পরিচিত সড়ক ধরে এগোলে এখন চোখে পড়ে এক পরিত্যক্ত ভূতুড়ে দালান। কালো হয়ে যাওয়া দেয়াল, ভাঙা জানালা আর চারদিকে শ্মশানের নীরবতা। অথচ দেড় বছর আগেও এই বাড়িটি ছিল নড়াইলের অলিখিত 'ক্ষমতার সচিবালয়'। বলছি জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক এবং সাবেক হুইপ মাশরাফি বিন মর্তুজার সেই স্বপ্নের বাড়ির কথা। যেখানে একসময় দিনরাত চলত রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞ, লবিং আর হাজারো মানুষের আনাগোনা, সেখানে আজ শুধুই হাহাকার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিক্ষুব্ধ জনতার রোষানলে পড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল মাশরাফির এই সুসজ্জিত ঘর। আজ ২০২৬ সালের ১ মার্চ; দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি, বরং সময়ের সাথে সাথে সেখানে জন্মেছে আগাছা আর জমেছে ধুলোর পুরু আস্তরণ।
বাড়ির প্রধান ফটকে এখন ঝুলছে মোটা শিকল আর মরিচা ধরা তালা। এক সময় যে গেট দিয়ে দাপটের সাথে প্রবেশ করতেন আমলা, জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা, সেই গেটের সামনে এখন ময়লার স্তূপ। এক সময়ের জমকালো গ্যারেজ, যেখানে সারি সারি দামী গাড়ি রাখা হতো, সেখানে এখন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে বুনো ঘাস। ভেতরের আসবাবপত্র, স্মৃতিচিহ্ন আর আভিজাত্যের সবটুকু পুড়েই ছাই হয়ে গিয়েছিল সেদিন। বাড়ির চারপাশের দেয়ালগুলো এখন আগুনের লেলিহান শিখার কালো দাগ বয়ে বেড়াচ্ছে। নড়াইলের মানুষের আবেগের প্রিয় ‘মাশরাফি’ আর রাজনীতিক ‘মাশরাফি’র দ্বন্দ্বে পুড়ে যাওয়া এই ইটের দেয়ালগুলো যেন এখন এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এখনো প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী এই বাড়ির সামনে আসেন, তবে তারা আর মাশরাফির সাথে দেখা করতে আসেন না। কেউ আসেন কৌতূহল নিয়ে ধ্বংসস্তূপ দেখতে, কেউ বা বিষণ্ণ মনে মোবাইলে ছবি তোলেন। স্থানীয়দের মনে এখন কেবল একটিই প্রশ্ন—সময়ের পরিক্রমায় নড়াইলের মহিষখোলার এই বাড়িটি কি কোনোদিন আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে? নাকি অযত্ন আর অবহেলায় ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায় হয়ে এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে মহাকালের সাক্ষী হিসেবে? রাজনীতির উত্থান-পতনের এক জীবন্ত দলিল হয়ে থাকা এই বাড়িটি এখন কেবল নড়াইলবাসীর স্মৃতিতে এক সময়ের জৌলুস আর বর্তমানের রিক্ততার গল্প বলে যায়।
দৈনিক চ্যানেল দিগন্ত